হাফিজুর রহমান:: দেশীয় স্পিনিং খাতের সক্ষমতা কাজে লাগাতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন এ খাতে কর্মরত শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। একই সঙ্গে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি ধরে রাখা এবং রিসাইকেল ও টেকসই পণ্যের উৎপাদনে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্পিনিং খাতে কর্মরত সাধারণ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ লিখিত বক্তব্য এসব দাবি জানান সালমা গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) আজহার আলী। এসময় সংগঠনটির আহ্বায়ক মো. শাহিনুল হক সহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে আজহার আলী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৭ সেপ্টেম্বরের আদেশ অনুযায়ী এইচএস হেডিং ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতাধীন ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের নির্ধারিত শর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থা দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা ব্যবহার এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকানোর ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ থাকায় প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হচ্ছে না। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার ব্যবহার বাড়লে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ মিলগুলো চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ৫৩০টি স্পিনিং মিল রয়েছে। এসব মিলে মোট স্পিন্ডল সক্ষমতা প্রায় ১৮ কোটি ২১ লাখ এবং বছরে সুতা উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা কমপক্ষে ৪২০ কোটি কেজি। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে ১১৭টি স্পিনিং মিল পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে ৪১৩টি মিল পূর্ণ বা আংশিকভাবে চালু রয়েছে। চালু মিলগুলোর ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা উৎপাদনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১৩০ কোটি কেজি। বিপরীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আসাইকুডা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৬০ লাখ কেজি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৬ কোটি কেজিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দুই অর্থবছরে এ ধরনের সুতা আমদানি প্রায় ১১৩ শতাংশ বেড়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার বাড়লে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং সুতা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে। পাশাপাশি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রির সুযোগও কমবে।তিনি বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্তির সঙ্গে রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বাড়বে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক।
স্পিনিং খাতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, একটি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সঙ্গে শুধু উৎপাদন নয়, শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ও পরিবারের জীবিকাও জড়িত। তাই শিল্পে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে এবং সরাসরি প্রায় ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর প্রায় ১ কোটি মানুষ নির্ভরশীল। সরকারের কাছে চার দফা প্রত্যাশা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের আমদানির সুযোগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বহাল রাখাতে হবে; শিল্পে বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি বজায় রাখতে হবে; শিল্প-ব্যাংকিং-কর্মসংস্থান ও রপ্তানির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে সমন্বিত টেক্সটাইল-আরএমজি নীতি গ্রহণ এবং রিসাইকেল ও টেকসই পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
আজহার আলী বলেন, আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্থিতিশীল নীতি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ এবং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের আমদানি সুবিধা চাই। দেশীয় স্পিনিং শিল্প সচল থাকলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও রপ্তানি সক্ষমতা— সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংবাদ সম্মেলনে স্পিনিং খাতে কর্মরত সাধারণ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।