জনতার নিঃশ্বাস প্রতিবেদন:: দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মন্ত্রী-এমপিদের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই অংশ হিসেবে অন্তত ৭০ জন সংসদ সদস্যকে রাখা হয়েছে ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণে’। পাশাপাশি মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে। শুধু তাই নয়, নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে দলীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের কর্মকাণ্ডও। সরকারের বিভিন্ন স্তরের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
শুধু মন্ত্রী-এমপিই নন, দলীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের কর্মকাণ্ডও এই পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বজায় থাকে এবং কোনো পর্যায়েই শৃঙ্খলাভঙ্গ বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি না হয়। এমনকি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কেও সরাসরি রিপোর্ট নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
জানা গেছে, যেসব এমপি নিজের এলাকায় নিয়মিত অবস্থান করছেন না, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বা প্রশাসনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন— তাদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একইভাবে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজি ও তদবির-বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেলেও তা গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগে এক, রাজশাহী বিভাগে তিন, খুলনা বিভাগে দুই, বরিশাল বিভাগে দুই, ময়মনসিংহ বিভাগে তিন, ঢাকা বিভাগে ৯, সিলেট বিভাগে দুই এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ১০ জনসহ অন্তত ৭০ এমপি রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কড়া নজরদারিতে।
যুক্তরাজ্যের মডেল থেকে শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান করায় সেখানে সরকার পরিচালনা ও জবাবদিহির পদ্ধতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সেই পদ্ধতিগুলো তিনি পর্যায়ক্রমে এখানেও বাস্তবায়ন করে দেখতে চান।
ওইসব নেতার অভিমত, যুক্তরাজ্য সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী কাঠামো রয়েছে, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে সংসদীয় ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন’। যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। এ প্রক্রিয়া সরকারকে নিয়মিতভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখে। এ ছাড়া ‘পার্লামেন্টারি সিলেক্ট কমিটি’ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ তদারকি করে এবং প্রয়োজনে মন্ত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ন্যাশনাল অডিট অফিস’ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা স্বাধীনভাবে সরকারি ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— সিভিল সার্ভিস, যেখানে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করার চেষ্টা করেন এবং তাদের ওপর কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা আলাপকালে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকেই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বললেন, ‘সরকার প্রাথমিকভাবে ১৮০ দিনের গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের অবশ্যই পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। দলের নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী চারদিকে যেভাবে খেয়াল রাখছেন, সেটা আশ্চর্যের ব্যাপার। এটা আমাদের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথাই মনে করিয়ে দেয়।’
‘সরকার শুরু থেকেই দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। দুর্নীতি নির্মূল এবং প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত কর্মসূচি বাস্তবায়নে মন্ত্রী-এমপিদের রয়েছে একটা বড় ভূমিকা। শুধু মন্ত্রী-এমপি কেন, এক্ষেত্রে দলের নেতাকর্মীদেরও সহায়কশক্তি হিসেবে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর যে লক্ষ্য-আদর্শ, চিন্তা-ভাবনা; সেটা মন্ত্রী-এমপি এবং দলের সবাইকে বুকে ধারণ করতে হবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে, দুর্নীতি নির্মূল হবে’— যোগ করলেন সেলিমা রহমান।
মন্ত্রী-এমপিদের পর্যবেক্ষণে রাখা ভালো— বদিউল আলম মজুমদার: জনকল্যাণে প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত কর্মসূচিকে সার্বিক অর্থে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বললেন, ‘গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি মন্ত্রী-এমপিদের একধরনের পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখেছেন, এটি ভালো।’
তবে তার অভিমত, ‘প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-এমপিদের স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব দিচ্ছেন, তাদের উপজেলায় বসার জায়গা করে দিচ্ছেন। আবার বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন তদারকিতে দলের সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা শুনছি। এমনটি হলে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আমার শঙ্কা, কোনো পর্যবেক্ষণ তখন হয়তো কাজ করবে না। কারণ, তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন, এতে করে তাদের অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, হাসিনার পতনের একটা বড় কারণ ছিল মন্ত্রী-এমপিদের বিভিন্ন অপকর্মে যুক্ত হওয়া।’